Pragmatism (Basic Principles and Educational Implications)
প্রয়োগবাদ (Pragmatism)
ভূমিকা:
প্রয়োগবাদ আধুনিক যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাদর্শন। এটি একটি এমন দর্শন যা বাস্তব জীবনের উপযোগিতা, কর্ম, অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। প্রয়োগবাদ মূলত এক ধরনের বাস্তবধর্মী চিন্তাধারা, যেখানে সত্য বা জ্ঞান কোনো স্থির বস্তু নয়, বরং সময় ও অবস্থার সঙ্গে পরিবর্তনশীল।
অর্থ ও উৎস: ‘Pragmatism’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Pragma’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ কর্ম, ব্যবহার বা কার্যকলাপ। অর্থাৎ, প্রয়োগবাদে গুরুত্ব দেওয়া হয় কর্মের ফলাফল ও বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতাকে।
এই দর্শনের প্রবর্তক ছিলেন চার্লস স্যান্ডার্স পিয়ার্স (Charles Sanders Peirce), যিনি ১৯শ শতকে এই মতবাদ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে উইলিয়াম জেমস (William James) একে বিস্তার করেন এবং পরে জন ডিউই (John Dewey) একে শিক্ষাদর্শন হিসেবে সুসংহত করেন।
উইলিয়াম জেমসের সংজ্ঞা:“Pragmatism is just an attitude of looking away from first things, principles, and dogmas, and of looking towards last things, fruits, and consequences.” অর্থাৎ, কোনো তত্ত্ব বা মতবাদের মূল্য নির্ভর করে তার বাস্তব ফলাফল বা ব্যবহারিক পরিণতির উপর।
প্রয়োগবাদের মূল বিশ্বাস: প্রয়োগবাদীরা বিশ্বাস করেন
1.সত্য কোনো স্থির ধারণা নয়;
2.সত্য পরিবর্তনশীল (Relativity of Truth) — সময়, স্থান ও প্রয়োজন অনুসারে সত্যের রূপ বদলায়;
3.বাস্তবতা একমুখী নয়, বরং বহুমুখী ও পরিবর্তনশীল (Reality is manifold and constantly changing);যা বাস্তবে কার্যকর ও উপকারী, সেটাই সত্য।
প্রয়োগবাদের প্রধান নীতি
1. সত্যের আপেক্ষিকতা (Relativity of Truth): কোনো সত্যই চিরস্থায়ী নয়; যা এক সময় সত্য, পরবর্তী সময়ে তা পরিবর্তিত হতে পারে।
2. উপযোগিতা নীতি (Principle of Utility): কোনো ধারণা বা কাজের মূল্য তার ব্যবহারিক প্রয়োগে নিহিত।
3. গণতান্ত্রিক নীতি (Principle of Democracy): সমাজে স্বাধীনতা, সমতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধের বিকাশ ঘটানোই এর উদ্দেশ্য।
4. সামাজিক সংহতি (Social Integration): শিক্ষা ও সমাজকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
5. অভিযোজন (Adaptation): মানুষ তার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয় এবং প্রয়োজনে পরিবেশকেও পরিবর্তিত করে নেয়।
6. স্বাধীনতা ও নমনীয়তা (Freedom & Flexibility): কঠোর নিয়ম ও কুসংস্কারের বিরোধী এই দর্শন স্বাধীন চিন্তাকে উৎসাহিত করে।
প্রয়োগবাদের তিনটি প্রধান রূপ
1. Humanistic Pragmatism (মানবতাবাদী প্রয়োগবাদ):মানুষের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজন পূরণকে সত্য বলে বিবেচনা করে।ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীন চিন্তাধারার উপর জোর দেয়।যেকোনো জ্ঞান বা কাজ যা মানুষকে উন্নতির পথে সাহায্য করে সেটাই সত্য।
2. Experimental Pragmatism (পরীক্ষামূলক প্রয়োগবাদ):কোনো ধারণাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া হয় তখনই, যখন তা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়।অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষার ফলই সত্যের ভিত্তি।
3. Biological Pragmatism (জৈব প্রয়োগবাদ):মানুষ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এবং প্রয়োজনে পরিবেশকেও নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নেয়।অভিযোজনের মাধ্যমে জীবনের উন্নতি ও সমস্যার সমাধানই এর মূল লক্ষ্য।
প্রয়োগবাদের মূল উদ্দেশ্য:মানুষের কার্যকর জ্ঞান সৃষ্টি করা,জীবনের সমস্যার বাস্তব সমাধান বের করা,সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো,এবং জীবনকে আনন্দময়, সফল ও গতিশীল করে তোলা।
শিক্ষায় প্রয়োগবাদের প্রভাব
১. প্রয়োগবাদ ও শিক্ষার লক্ষ্য (Pragmatism & Aims of Education): প্রয়োগবাদী শিক্ষাদর্শনে শিক্ষার লক্ষ্য স্থির নয়— এটি পরিবেশ, সমাজ ও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল।ডিউই তাঁর ‘Democracy and Education’ গ্রন্থে বলেছেন, “The general aim of education is more education.”অর্থাৎ শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ক্রমাগত শিক্ষা অর্জন করা।
প্রয়োগবাদে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো—জীবনের সমস্যাগুলির বাস্তব সমাধান খুঁজে বের করা,নতুন মূল্যবোধ সৃষ্টি করা,এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিকাশের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক জীবন গড়ে তোলা।
এই দর্শন স্থায়ী সত্যে বিশ্বাস করে না; সমাজের চাহিদা ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবোধ ও জ্ঞান পরিবর্তিত হয়।
২. প্রয়োগবাদ ও পাঠক্রম (Pragmatism & Curriculum):
প্রয়োগবাদী শিক্ষাদর্শনে পাঠক্রম জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। কোনো নির্দিষ্ট, কঠোর বা স্থায়ী পাঠক্রম নয়; বরং সময়, সমাজ ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুসারে তা পরিবর্তনযোগ্য হবে।প্রয়োগবাদীরা কর্মকেন্দ্রিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক পাঠক্রমের উপর গুরুত্ব দেন।তারা পাঠ্যবিষয়ের মধ্যে সমন্বয়ের নীতি (Principle of Integration) অনুসরণের পরামর্শ দেন— যাতে জ্ঞান খণ্ডিত না হয়ে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সংহত হয়।
পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ:
ব্যবহারিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা
প্রকৃতিবীক্ষণ, গণিত, অঙ্কন, কারুশিল্প
ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, ভাষা
স্বাস্থ্য ও শারীরশিক্ষা
পাঠক্রমের মূল উদ্দেশ্য— “শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা ও কার্যকলাপের মাধ্যমে শেখা।”
৩. প্রয়োগবাদ ও শিক্ষণপদ্ধতি (Pragmatism & Method of Teaching):
প্রয়োগবাদী শিক্ষাদর্শনে ‘Learning by Doing’ (করে শেখা) নীতি অনুসরণ করা হয়।এই দর্শনের শিক্ষণপদ্ধতি হচ্ছে অভিজ্ঞতাভিত্তিক, কর্মকেন্দ্রিক ও সমস্যাসমাধানমূলক।ডিউই-এর প্রবর্তিত “Project Method” এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।এই পদ্ধতিতে—
শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে করতে শেখে,
শেখা হয় আনন্দের মধ্য দিয়ে,
এবং শিক্ষার্থীর চিন্তা, কল্পনা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বিকশিত হয়।
শিক্ষা আর পুস্তককেন্দ্রিক নয়— বরং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও জীবনকেন্দ্রিক।
৪. প্রয়োগবাদ ও শিক্ষক (Pragmatism & Teacher):
প্রয়োগবাদে শিক্ষক গাইড বা সহায়ক (Guide and Facilitator) হিসেবে বিবেচিত।শিক্ষক কোনো তথ্যদাতা নয়, বরং এমন এক ব্যক্তি যিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা, অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতাকে পরিচালিত করেন।শিক্ষকের করণীয়—
শিক্ষার্থীর জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে স্বাধীনভাবে চিন্তা ও কাজ করতে পারে,
দলগত কার্যকলাপের মাধ্যমে সামাজিক সহযোগিতা শেখানো,
শিক্ষার বিষয়বস্তুকে জীবনঘনিষ্ঠ করে তোলা।
প্রয়োগবাদী শিক্ষক শিশুর অভ্যন্তরীণ শক্তি ও সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করেন এবং বিদ্যালয়কে সমাজের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে গড়ে তোলেন।
৫. প্রয়োগবাদ ও শৃঙ্খলা (Pragmatism & Discipline):
প্রয়োগবাদে শৃঙ্খলা বহিরাগত নয়, আত্মনিয়ন্ত্রিত (Self-discipline)।
ডিউই-এর মতে, “Discipline is a mental attitude.”
বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা কোনো আরোপিত নিয়ম নয়— এটি আসে শিক্ষার্থীর আগ্রহ, স্বাধীনতা ও আনন্দ থেকে।গণতান্ত্রিক পরিবেশে দলগত কর্ম, সহানুভূতি ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই প্রকৃত সামাজিক শৃঙ্খলা গড়ে ওঠে।
৬. প্রয়োগবাদ ও বিদ্যালয় (Pragmatism & School):
বিদ্যালয়কে সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ হিসেবে দেখা হয়।এখানে শিশুরা বাস্তব জীবনের মতো সহযোগিতা, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও গণতান্ত্রিক আচরণের অনুশীলন করে।বিদ্যালয় তাই কেবল জ্ঞানার্জনের স্থান নয়, বরং জীবনের অনুশীলনক্ষেত্র।
প্রয়োগবাদ এমন একটি শিক্ষাদর্শন যা কর্ম, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি আমাদের শেখায় যে জ্ঞানের মূল্য কেবল তখনই, যখন তা জীবনে কার্যকর হয়। ডিউইয়ের ভাষায়— “Education is life itself.”অর্থাৎ, শিক্ষা শুধু জীবনের প্রস্তুতি নয়, শিক্ষা নিজেই জীবন।প্রয়োগবাদ জীবনের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করে, তাই এটি আধুনিক শিক্ষার এক বাস্তব ও মানবিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।Pragmatism এমন এক শিক্ষা-দর্শন, যা জীবনের সঙ্গে শিক্ষাকে একীভূত করে। এটি কেবল বই-পুস্তক ভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানমুখী শিক্ষা।
এই দর্শনের ফলে শিক্ষা হয়েছে প্রাণবন্ত, কর্মমুখী ও সমাজোপযোগী।শিক্ষার্থী শেখে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, নিজের কাজের মাধ্যমে এবং নিজের ভুলের মধ্য দিয়েঅতএব বলা যায় —“Pragmatism শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে,এবং জীবনের মধ্যেই শিক্ষাকে সত্য করে তোলে।”এ দর্শনের শিক্ষা আজকের পরিবর্তনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর, গণতান্ত্রিক সমাজে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি শেখায় —“করে শেখো, ভেবে কাজ করো, আর অভিজ্ঞতা থেকেই সত্যকে খুঁজে নাও।”
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন